একটা মানুষ এতটা নিষ্পাপ আর মায়াবী হতে পারে সেটা আমি চোখের দেখায় শুধুমাত্র অবন্তী কেই দেখেছিলাম ।
ওর মাঝে যে পবিত্রতা তা আর কোথাও খুজে পাই নি।
সত্যি বলতে খুজতে যাই নি ।
অবন্তী কেও আমি খুজে বের করি নি।
ও নিজেই আমায় খুজে নিয়েছিলো আর জড়িয়েছিল তার অদ্ভুত মায়াজাল এ...
জড়িয়ে ছিল বললাম, কারণ ওকে আর খুব বেশি সময় এর জন্য হয়তো পাবো না। ওর খুব বাজে রকমের একটা অসুখ হয়েছে, ডাক্তার বলেছে অলৌকিক কিছু না হলে হাতে আর খুব বেশি সময় নেই । ও এখন ICU তে ভর্তি । যেখানে সাধারণ মানুষ এর প্রবেশ নিষেধ, আর সেখানে আমি তো সাধারণ এর নিচে অতি অতি অতি সাধারণ মানুষ । আমি পরিবারের কেউ না নিতান্তই অপরিচিত একজন মানুষ । আমাকে ঢুকতে দেয়ার প্রশ্ন ই আসে না । আমি ফুটপাত ধরে পায়াচারি করছি আর একটু পরপর ডাবওয়ালা দের কাছ থেকে ডাব কেনার অফার পাচ্ছি। তারা পারলে ২টার সাথে একটা ফ্রি দিয়ে হলেও আমাকে ডাব কেনাবে ।
আমি বিরক্ত হয়ে যখনই ভাবলাম রাস্তার ওপাশ টায় চলে যাবো, তখন ই পেছন থেকে কেউ একজন আমাকে ডাক দিলো,
কবি.?
ফিরে দেখি অবন্তীর মামা। মামা কিনা চাচা তাও এখনো বলতে পারছি না। ওদের পরিবারের প্রায় অনেকের সাথেই আমার দেখা হয়েছে, টুকটাক কুশলাদি ও বিনিময় হয়েছিলো অবন্তির কল্যানে। কিন্তু আমার মস্তিষ্ক তাদের ব্যাপারে বিন্দুমাত্র আগ্রহ বোধ করে নি বলেই হয়তো তাদের ফেইস আর আইডি স্টোর করে রাখে নি । মস্তিষ্কের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু তে ওই একজন ই। অবন্তি..!
ব্যাপার টা অলৌকিক ।
এখানে আমার কোনো হাত নেই ।
মেয়েটা কীভাবে গোটা রাজ্য টা দখল করে নিলো আর আমাকে বানিয়ে রেখেছে এখন প্রহরী..!
নিজেকে আজকাল তুচ্ছ মনে হয়, খুব তুচ্ছ।
তবে কিছু কিছু তুচ্ছতায় আনন্দ আছে, কিছু কিছু হেরে যাওয়ায় প্রাপ্তি আছে ।
অবন্তী আমার সেই প্রাপ্তির ই নামান্তর ।
তবে ওকে আর পেলাম কই..!
ও এখন আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে।।
"আপনাকে রোগীর সাথে সাক্ষাৎ করতে হবে, রোগী আপনাকে দেখতে চায় "
অহ,আমি এতোক্ষণ ভুল ভাবছিলাম,
লোকটা হয়তো হাসপাতালের কেউ একজন হবে,অবন্তীর পরিবার এর কেউ অবন্তী কে রোগী বলে সম্বোধন করবে না..
আমি বললাম, চলুন। যাওয়া যাক।
আমরা দুজন বারান্দা দিয়ে হন হন করে আগাচ্ছি। কারো মুখে কোনো কথা নেই।
লোকটা শুধু একবার বিরষ মুখে জিজ্ঞেস করেছিলো, আপনি রোগীর কে হন?
আমি বললাম, বন্ধু।
বাপরে..! বন্ধুর জন্য এতো দরদ...!
আমি আর কথা বাড়াই নি, আমার জন্য অবন্তীর এতো দরদ যার হজম হয় না,তারসাথে কথা বলার কোন ইচ্ছা ই নেই।
আমরা বারান্দা থেকে হুট করেই ডান দিকে একটা প্যাসেজ এ ঢুকে গেলাম, সেখানে দিনের আলোর কোনো ছিটেফোঁটা নেই, আছে শুধু কৃত্রিম আলো।
ফিনাইল এর কড়া গন্ধ।
এতো ক্ষণ মানুষজন এর কোলাহল ছিলো,
আস্তে আস্তে সবকিছু মিলিয়ে গেলো। কেমন যেন একটা ভয়ংকর নিস্তব্ধতা..!
আমরা যতই এগুচ্ছি ততই এটা গাড় হচ্ছে। আমার কলিজা ঠান্ডা হয়ে যেতে শুরু করেছে ।
মনে হচ্ছে মৃত্যুপুরী তে ঢুকতে যাচ্ছি....
এতো চঞ্চল,ছটফটে একটা মেয়ে কীভাবে এখানে পড়ে আছে ভাবতে অবাক লাগছে একই সাথে কষ্ট হচ্ছে । আমরা খুব সম্ভবত চলে এসেছি, লোকটা হাত ইশারায় আমাকে থামিয়ে বাইরে রেখে ভেতরে ঢুকে গেলো। আমি ভাবছিলাম ওদের পরিবার এর লোকজন হয়তো থাকবে, কিন্তু আশেপাশে কাউকেই পেলাম না..! ফিরে এলো ৩/৪ মিনিট পর। বললো, সময় ৫ মিনিট। এর থেকে এক সেকেন্ড বেশি যেন না হয়। এর ভেতরে দেখা করে চলে আসবেন। আমাকে আগাগোড়া স্প্রে করে ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়া হলো।
আগামী ৫ মিনিট এর প্রত্যেক টা সেকেন্ড আমার কাছে খুব মূল্যবান । রুমে ঢুকতে ঢুকতে ই হয়তো ১০/১৫ সেকেন্ড চলে গেছে! ভাবছিলাম ঢুকে দেখবো, ও চোখ বুজে শুয়ে আছে, কিন্তু নাহ..! ঢুকতেই তার চোখে চোখ পড়লো আমার, সেই আগের মতই জ্বলজ্বলে দৃষ্টি তে তাকিয়ে আছে আমার দিকে শুধু নেই আগের সেই উজ্জ্বলতা। আমি ওর দিকে তাকিয়ে একটু হাসার চেষ্টা করলাম, জানি না কি করা উচিত। এতো সুন্দর পবিত্র একটা মানুষের ভেতর এমন বিদঘুটে অসুখ কীভবে বাসা বাধতে পারে..! আমি ভেবে পেলাম না!
ওর বাম হাতে ক্যানুলা করা, হাত প্রায় নীলাভ হয়ে আছে, স্যালাইন চলছে। নাকে নল লাগানো, আশেপাশে কতো কি যন্ত্রপাতি! মনিটর, মেশিন এর বিপ বিপ শব্দ, পালস এর উঠানামা। একটা মানুষ কে বাচিয়ে রাখার জন্য কতোই না আয়োজন!
অবন্তী স্পষ্ট স্বরে বললো,
কবি..!
হু
বসো..পাশে বসো আমার।
আমি পাশে বসলাম, কি বলবো, কি বলা উচিত, কথা খুজে পাচ্ছি না। আমার শব্দ ভান্ডার হঠাৎই ফাকা হয়ে গেছে।কোনো শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না,এদিকে সময় ও ফুরিয়ে আসছে, আর কত সেকেন্ড বাকি আছে কে জানে! সাথে তো ঘড়ি ও নেই..!
এবারেও অবন্তি নীড়বতা ভাংলো..
কবি..
হু
আমার হাত টা ধরো তো একটু
তোমার হাতে তো স্যালাইন লাগানো..
উহু,বাম না ডান হাত,দেখো,ডান হাত একদম খালি, একটা সুই এর খোচা অব্দি লাগতে দেই নি । ডাক্তার কে বলেছি ডান হাত যেনো সবকিছু থেকে ফ্রি রাখে যতটা পারা যায়। তারা তাই করেছে। মরে যাচ্ছি তো, মরে যাওয়ার আগে মানুষের কথা খুব গুরুত্ব দিয়ে শোনা হয় শুধুমাত্র আফসোস এর ব্যাপার হলো এই গুরুত্ব টা বেচে থাকা মানুষের বেশি দরকার আর তারাই সেটা পায় না.!
অবন্তি ফটফট করে কথা বলে যাচ্ছে, আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি,এই সুন্দর কথাবলা মানুষ টা আর পৃথিবী তে থাকবে না!
এ ও কি সম্ভব..?
ওর জন্য কি পৃথিবীর এতোটুকু ও খারাপ লাগবে না.?
শূন্যতা কাজ করবে না..?
পৃথিবীতে এক অবন্তী মরে গিয়ে হয়তো একই সময়ে আরো লক্ষ্য মানব শিশু জন্মাবে ।
পৃথিবী ওর অভাব বুঝবে না ।
কিন্তু আমার পুরো পৃথিবী জুড়েই তো ছিলো অবন্তীর রাজত্য..!
ওর অভাব তো কখনো আমার পূরণ হবে না!
কি হলো..? এই কবি..! কি ভাবছো..?
নাহ,তেমন কিছু না..
তাহলে বলো তো,ডান হাত টা কেন ফ্রি করে রাখতে বলেছি.?
সব গুরুত্বপূর্ণ কাজ তো মানুষ ডান হাতেই করে,তাই। খাওয়া দাওয়া ও তো ডান হাতেই করে মানুষ।
তুমি পাগল একটা, ICU তে ঢুকে বসে বসে কেউ খাওয়া দাওয়া করে..? আর এখানে কীসের গুরুত্বপূর্ণ কাজ আমার..মরে যাই যাই অবস্থা..! তবে হ্যাঁ, আছে একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ,ওইটার জন্যই ফ্রি রাখতে বলেছিলাম। আর তা হলো তুমি ডান হাত টা এসে ধরবে আমার। তুমি নিজে থেকে কখনোই আমার হাত ধরোনি। আমি খুব করে চাইতাম তোমার হাত ধরে পাশাপাশি রাস্তায় হাটতে। আমাদের হাটা হয়েছে অনেক,পাশা পাশি চলা হয়েছে অনেক পথ ও.. হাত শুধু ধরা হয় নি.. হাত ধরো কবি..
আমি অবন্তির ডান হাত স্পর্শ করলাম অসম্ভব কোমল হাতটা কেমন যেন হীম শীতল হয়ে আছে এসি এর ঠান্ডায় । এই হাত ধরে সারাজীবন পাড় করে দেয়া যায়..
কবি...
হু..
কি ভাবছো..?
নাহ,তেমন কিছু না..
ভাবছো জানি,কিন্তু বলবে না..আজীবন রহস্যের আড়ালেই থেকে গেলে..
আসলে আমাদের জীবন টাই খুব রহস্যময় অবন্তী, নতুন করে রহস্য করার কিছু নেই এখানে ।
কবি..
হু,
হু কি,আমার চোখের দিকে তাকাও, নিচে কি দেখছো..?
আমি অবন্তির চোখের দিকে তাকালাম,ওর চোখ ভর্তি পানি । টলমল করছে, মেয়েটা যেকোনো সময় কেদে দিবে । আমি আগের মতোই কথা বলার জন্য শব্দ খুজে পাচ্ছি না,শব্দ দিয়ে বাক্য গঠন হচ্ছে না। আমার কথা বলা হচ্ছে না.. আমি যখন কথা বলার জন্য শব্দ খুজছি তখন দড়জায় শব্দ শুনতে পেলাম,খুব সম্ভবত ৫ মিনিট এর উপর হয়ে গেছে আর আমার কিছুই বলা হলো না তেমন এখনো..
কবি,
হু,
হাতটা কি আরেক টু শক্ত করে ধরতে পারো না..?
আমি আরো শক্তভাবে ধরলাম, ওর চোখ দিয়ে এখন ফোটা ফোটা পানি গড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে।
আমাকে কখনো ছেড়ে যাবা না তো..কবি?
নাহ,কখনো না..
যদি আর না ফেরা হয় আমার,তাহলে ভুলে যাবা না তো..
নাহ, কখনো ভুলবো না..কোন দিন না..
সত্যি তো..?
হ্যাঁ সত্যি.. সত্যি সত্যি..
রুমের দড়জায় আবার শব্দ শুনতে পাচ্ছি, আমি বললাম,আমার উঠতে হবে অবন্তী, যাই আমি, সময় শেষ..
আমার সময় ও তো শেষ হয়ে আসছে..
আমাদের সবার সময় ই শেষ হয়ে আসছে অবন্তি ।
ও এখনো আমার হাত শক্ত করে ধরে আছে, অঝোরে কাদছে মেয়েটা।
কয়েকবার বলার পর আস্তে আস্তে নিজেকে মুক্ত করে চোখ বুজে বললো,
তোমার চলে যাওয়াটা দেখতে ইচ্ছে করছে না, প্লিজ আস্তে করে চলে যাও,
নিজের খেয়াল রেখো, এভাবে ছন্ন ছাড়া এলোমেলো আর কতদিন থাকবে, একটু যত্নশীল হউ নিজের প্রতি...
ও কথা বলেই যাচ্ছে,,
আমি ওকে রেখে দরজার দিকে এগুচ্ছি। বের হওয়ার পর ওই লোক টা হয়তো রেগে গিয়ে কিছু একটা আমাকে বললো, কেন এতো লেইট হলো..এসব. কিন্তু কোন কথাই আমার মাথায় ঢুকলো না। আমি এখন প্রচন্ড ঘোর এর মাঝে আছি,আর এভাবেই থাকতে চাই।
এই ঘোর যেনো না কাটে.. মৃত্যুর আগে সাধারণত মানুষ তার সব চাইতে প্রিয় মানুষের সাথে কথা বলতে চায়,দেখা করতে চায়,
পাশে পেতে চায়।
অবন্তি আমাকে চেয়েছে ।
তার কাছে আমি প্রিয় মানুষ জানতাম কিন্তু এতোটাই প্রিয় কখনোই কল্পনা করিনি।
নিজেকে সব সময় ই অপদার্থ দের কাতারে বসিয়ে রেখেছি আর ভেবেছি কেউ আমাকে চায় না।
অবন্তীর ঠাই বাস্তবতায় না হলেও
ও থাকবে আমার কল্পনায়, চিন্তায় আর চেতনায়,
অবিরাম ভাবনায় । ওকে কতটা পছন্দ করি কখনো বুঝতে দেই নি , বলি নি,
কীংবা বলতে গেলেও শব্দ খুজে পাই নি, শব্দ দিয়ে আর বাক্য গঠন হয় নি।
ভালোই হয়েছে, সব কিছু বলা হয়ে গেলে হয়তো আর টান থাকতো না,
এই শূন্য তা,এই হাহাকার টা কাজ করতো না....
আজ থেকে আরো কয়েক বছর পর কোনো এক বর্ষার রাতে
আমার ঘুম আসবে না, আমি বিছানায় এপাশ ওপাশ করা বাদ দিয়ে জানালার পর্দা সরিয়ে গিয়ে দাড়াবো ।
বাইরে ঝুম বৃষ্টি দেখে আমার তখন অবন্তীর কথা মনে পড়বে,
খুউব বেশি মনে পড়বে ।
ও বলেছিলো, কোনো এক বর্ষার রাতে তুমি আমি ঝুম বৃষ্টি তে ভিজবো সারা রাত,
যে পর্যন্ত না গা গরম হয়ে জ্বর আসবে ততক্ষণ ভিজতেই থাকবো..
তখন আমার বয়স হয়েছে অনেক, ডাক্তার বলেছে ঠান্ডা লাগাতে বারণ।
তারপরেও আমি একাই দরজা খুলে বের হবো..
বৃষ্টিতে গিয়ে দাড়াবো, কারণ বৃষ্টিতে কাদলে কেউ বুঝবে না..
পুরুষ দের তো আবার কাদতে নেই..!
-কবি #অবন্তী
০৯-০১-২০২১
ওর মাঝে যে পবিত্রতা তা আর কোথাও খুজে পাই নি।
সত্যি বলতে খুজতে যাই নি ।
অবন্তী কেও আমি খুজে বের করি নি।
ও নিজেই আমায় খুজে নিয়েছিলো আর জড়িয়েছিল তার অদ্ভুত মায়াজাল এ...
জড়িয়ে ছিল বললাম, কারণ ওকে আর খুব বেশি সময় এর জন্য হয়তো পাবো না। ওর খুব বাজে রকমের একটা অসুখ হয়েছে, ডাক্তার বলেছে অলৌকিক কিছু না হলে হাতে আর খুব বেশি সময় নেই । ও এখন ICU তে ভর্তি । যেখানে সাধারণ মানুষ এর প্রবেশ নিষেধ, আর সেখানে আমি তো সাধারণ এর নিচে অতি অতি অতি সাধারণ মানুষ । আমি পরিবারের কেউ না নিতান্তই অপরিচিত একজন মানুষ । আমাকে ঢুকতে দেয়ার প্রশ্ন ই আসে না । আমি ফুটপাত ধরে পায়াচারি করছি আর একটু পরপর ডাবওয়ালা দের কাছ থেকে ডাব কেনার অফার পাচ্ছি। তারা পারলে ২টার সাথে একটা ফ্রি দিয়ে হলেও আমাকে ডাব কেনাবে ।
আমি বিরক্ত হয়ে যখনই ভাবলাম রাস্তার ওপাশ টায় চলে যাবো, তখন ই পেছন থেকে কেউ একজন আমাকে ডাক দিলো,
কবি.?
ফিরে দেখি অবন্তীর মামা। মামা কিনা চাচা তাও এখনো বলতে পারছি না। ওদের পরিবারের প্রায় অনেকের সাথেই আমার দেখা হয়েছে, টুকটাক কুশলাদি ও বিনিময় হয়েছিলো অবন্তির কল্যানে। কিন্তু আমার মস্তিষ্ক তাদের ব্যাপারে বিন্দুমাত্র আগ্রহ বোধ করে নি বলেই হয়তো তাদের ফেইস আর আইডি স্টোর করে রাখে নি । মস্তিষ্কের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু তে ওই একজন ই। অবন্তি..!
ব্যাপার টা অলৌকিক ।
এখানে আমার কোনো হাত নেই ।
মেয়েটা কীভাবে গোটা রাজ্য টা দখল করে নিলো আর আমাকে বানিয়ে রেখেছে এখন প্রহরী..!
নিজেকে আজকাল তুচ্ছ মনে হয়, খুব তুচ্ছ।
তবে কিছু কিছু তুচ্ছতায় আনন্দ আছে, কিছু কিছু হেরে যাওয়ায় প্রাপ্তি আছে ।
অবন্তী আমার সেই প্রাপ্তির ই নামান্তর ।
তবে ওকে আর পেলাম কই..!
ও এখন আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে।।
"আপনাকে রোগীর সাথে সাক্ষাৎ করতে হবে, রোগী আপনাকে দেখতে চায় "
অহ,আমি এতোক্ষণ ভুল ভাবছিলাম,
লোকটা হয়তো হাসপাতালের কেউ একজন হবে,অবন্তীর পরিবার এর কেউ অবন্তী কে রোগী বলে সম্বোধন করবে না..
আমি বললাম, চলুন। যাওয়া যাক।
আমরা দুজন বারান্দা দিয়ে হন হন করে আগাচ্ছি। কারো মুখে কোনো কথা নেই।
লোকটা শুধু একবার বিরষ মুখে জিজ্ঞেস করেছিলো, আপনি রোগীর কে হন?
আমি বললাম, বন্ধু।
বাপরে..! বন্ধুর জন্য এতো দরদ...!
আমি আর কথা বাড়াই নি, আমার জন্য অবন্তীর এতো দরদ যার হজম হয় না,তারসাথে কথা বলার কোন ইচ্ছা ই নেই।
আমরা বারান্দা থেকে হুট করেই ডান দিকে একটা প্যাসেজ এ ঢুকে গেলাম, সেখানে দিনের আলোর কোনো ছিটেফোঁটা নেই, আছে শুধু কৃত্রিম আলো।
ফিনাইল এর কড়া গন্ধ।
এতো ক্ষণ মানুষজন এর কোলাহল ছিলো,
আস্তে আস্তে সবকিছু মিলিয়ে গেলো। কেমন যেন একটা ভয়ংকর নিস্তব্ধতা..!
আমরা যতই এগুচ্ছি ততই এটা গাড় হচ্ছে। আমার কলিজা ঠান্ডা হয়ে যেতে শুরু করেছে ।
মনে হচ্ছে মৃত্যুপুরী তে ঢুকতে যাচ্ছি....
এতো চঞ্চল,ছটফটে একটা মেয়ে কীভাবে এখানে পড়ে আছে ভাবতে অবাক লাগছে একই সাথে কষ্ট হচ্ছে । আমরা খুব সম্ভবত চলে এসেছি, লোকটা হাত ইশারায় আমাকে থামিয়ে বাইরে রেখে ভেতরে ঢুকে গেলো। আমি ভাবছিলাম ওদের পরিবার এর লোকজন হয়তো থাকবে, কিন্তু আশেপাশে কাউকেই পেলাম না..! ফিরে এলো ৩/৪ মিনিট পর। বললো, সময় ৫ মিনিট। এর থেকে এক সেকেন্ড বেশি যেন না হয়। এর ভেতরে দেখা করে চলে আসবেন। আমাকে আগাগোড়া স্প্রে করে ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়া হলো।
আগামী ৫ মিনিট এর প্রত্যেক টা সেকেন্ড আমার কাছে খুব মূল্যবান । রুমে ঢুকতে ঢুকতে ই হয়তো ১০/১৫ সেকেন্ড চলে গেছে! ভাবছিলাম ঢুকে দেখবো, ও চোখ বুজে শুয়ে আছে, কিন্তু নাহ..! ঢুকতেই তার চোখে চোখ পড়লো আমার, সেই আগের মতই জ্বলজ্বলে দৃষ্টি তে তাকিয়ে আছে আমার দিকে শুধু নেই আগের সেই উজ্জ্বলতা। আমি ওর দিকে তাকিয়ে একটু হাসার চেষ্টা করলাম, জানি না কি করা উচিত। এতো সুন্দর পবিত্র একটা মানুষের ভেতর এমন বিদঘুটে অসুখ কীভবে বাসা বাধতে পারে..! আমি ভেবে পেলাম না!
ওর বাম হাতে ক্যানুলা করা, হাত প্রায় নীলাভ হয়ে আছে, স্যালাইন চলছে। নাকে নল লাগানো, আশেপাশে কতো কি যন্ত্রপাতি! মনিটর, মেশিন এর বিপ বিপ শব্দ, পালস এর উঠানামা। একটা মানুষ কে বাচিয়ে রাখার জন্য কতোই না আয়োজন!
অবন্তী স্পষ্ট স্বরে বললো,
কবি..!
হু
বসো..পাশে বসো আমার।
আমি পাশে বসলাম, কি বলবো, কি বলা উচিত, কথা খুজে পাচ্ছি না। আমার শব্দ ভান্ডার হঠাৎই ফাকা হয়ে গেছে।কোনো শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না,এদিকে সময় ও ফুরিয়ে আসছে, আর কত সেকেন্ড বাকি আছে কে জানে! সাথে তো ঘড়ি ও নেই..!
এবারেও অবন্তি নীড়বতা ভাংলো..
কবি..
হু
আমার হাত টা ধরো তো একটু
তোমার হাতে তো স্যালাইন লাগানো..
উহু,বাম না ডান হাত,দেখো,ডান হাত একদম খালি, একটা সুই এর খোচা অব্দি লাগতে দেই নি । ডাক্তার কে বলেছি ডান হাত যেনো সবকিছু থেকে ফ্রি রাখে যতটা পারা যায়। তারা তাই করেছে। মরে যাচ্ছি তো, মরে যাওয়ার আগে মানুষের কথা খুব গুরুত্ব দিয়ে শোনা হয় শুধুমাত্র আফসোস এর ব্যাপার হলো এই গুরুত্ব টা বেচে থাকা মানুষের বেশি দরকার আর তারাই সেটা পায় না.!
অবন্তি ফটফট করে কথা বলে যাচ্ছে, আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি,এই সুন্দর কথাবলা মানুষ টা আর পৃথিবী তে থাকবে না!
এ ও কি সম্ভব..?
ওর জন্য কি পৃথিবীর এতোটুকু ও খারাপ লাগবে না.?
শূন্যতা কাজ করবে না..?
পৃথিবীতে এক অবন্তী মরে গিয়ে হয়তো একই সময়ে আরো লক্ষ্য মানব শিশু জন্মাবে ।
পৃথিবী ওর অভাব বুঝবে না ।
কিন্তু আমার পুরো পৃথিবী জুড়েই তো ছিলো অবন্তীর রাজত্য..!
ওর অভাব তো কখনো আমার পূরণ হবে না!
কি হলো..? এই কবি..! কি ভাবছো..?
নাহ,তেমন কিছু না..
তাহলে বলো তো,ডান হাত টা কেন ফ্রি করে রাখতে বলেছি.?
সব গুরুত্বপূর্ণ কাজ তো মানুষ ডান হাতেই করে,তাই। খাওয়া দাওয়া ও তো ডান হাতেই করে মানুষ।
তুমি পাগল একটা, ICU তে ঢুকে বসে বসে কেউ খাওয়া দাওয়া করে..? আর এখানে কীসের গুরুত্বপূর্ণ কাজ আমার..মরে যাই যাই অবস্থা..! তবে হ্যাঁ, আছে একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ,ওইটার জন্যই ফ্রি রাখতে বলেছিলাম। আর তা হলো তুমি ডান হাত টা এসে ধরবে আমার। তুমি নিজে থেকে কখনোই আমার হাত ধরোনি। আমি খুব করে চাইতাম তোমার হাত ধরে পাশাপাশি রাস্তায় হাটতে। আমাদের হাটা হয়েছে অনেক,পাশা পাশি চলা হয়েছে অনেক পথ ও.. হাত শুধু ধরা হয় নি.. হাত ধরো কবি..
আমি অবন্তির ডান হাত স্পর্শ করলাম অসম্ভব কোমল হাতটা কেমন যেন হীম শীতল হয়ে আছে এসি এর ঠান্ডায় । এই হাত ধরে সারাজীবন পাড় করে দেয়া যায়..
কবি...
হু..
কি ভাবছো..?
নাহ,তেমন কিছু না..
ভাবছো জানি,কিন্তু বলবে না..আজীবন রহস্যের আড়ালেই থেকে গেলে..
আসলে আমাদের জীবন টাই খুব রহস্যময় অবন্তী, নতুন করে রহস্য করার কিছু নেই এখানে ।
কবি..
হু,
হু কি,আমার চোখের দিকে তাকাও, নিচে কি দেখছো..?
আমি অবন্তির চোখের দিকে তাকালাম,ওর চোখ ভর্তি পানি । টলমল করছে, মেয়েটা যেকোনো সময় কেদে দিবে । আমি আগের মতোই কথা বলার জন্য শব্দ খুজে পাচ্ছি না,শব্দ দিয়ে বাক্য গঠন হচ্ছে না। আমার কথা বলা হচ্ছে না.. আমি যখন কথা বলার জন্য শব্দ খুজছি তখন দড়জায় শব্দ শুনতে পেলাম,খুব সম্ভবত ৫ মিনিট এর উপর হয়ে গেছে আর আমার কিছুই বলা হলো না তেমন এখনো..
কবি,
হু,
হাতটা কি আরেক টু শক্ত করে ধরতে পারো না..?
আমি আরো শক্তভাবে ধরলাম, ওর চোখ দিয়ে এখন ফোটা ফোটা পানি গড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে।
আমাকে কখনো ছেড়ে যাবা না তো..কবি?
নাহ,কখনো না..
যদি আর না ফেরা হয় আমার,তাহলে ভুলে যাবা না তো..
নাহ, কখনো ভুলবো না..কোন দিন না..
সত্যি তো..?
হ্যাঁ সত্যি.. সত্যি সত্যি..
রুমের দড়জায় আবার শব্দ শুনতে পাচ্ছি, আমি বললাম,আমার উঠতে হবে অবন্তী, যাই আমি, সময় শেষ..
আমার সময় ও তো শেষ হয়ে আসছে..
আমাদের সবার সময় ই শেষ হয়ে আসছে অবন্তি ।
ও এখনো আমার হাত শক্ত করে ধরে আছে, অঝোরে কাদছে মেয়েটা।
কয়েকবার বলার পর আস্তে আস্তে নিজেকে মুক্ত করে চোখ বুজে বললো,
তোমার চলে যাওয়াটা দেখতে ইচ্ছে করছে না, প্লিজ আস্তে করে চলে যাও,
নিজের খেয়াল রেখো, এভাবে ছন্ন ছাড়া এলোমেলো আর কতদিন থাকবে, একটু যত্নশীল হউ নিজের প্রতি...
ও কথা বলেই যাচ্ছে,,
আমি ওকে রেখে দরজার দিকে এগুচ্ছি। বের হওয়ার পর ওই লোক টা হয়তো রেগে গিয়ে কিছু একটা আমাকে বললো, কেন এতো লেইট হলো..এসব. কিন্তু কোন কথাই আমার মাথায় ঢুকলো না। আমি এখন প্রচন্ড ঘোর এর মাঝে আছি,আর এভাবেই থাকতে চাই।
এই ঘোর যেনো না কাটে.. মৃত্যুর আগে সাধারণত মানুষ তার সব চাইতে প্রিয় মানুষের সাথে কথা বলতে চায়,দেখা করতে চায়,
পাশে পেতে চায়।
অবন্তি আমাকে চেয়েছে ।
তার কাছে আমি প্রিয় মানুষ জানতাম কিন্তু এতোটাই প্রিয় কখনোই কল্পনা করিনি।
নিজেকে সব সময় ই অপদার্থ দের কাতারে বসিয়ে রেখেছি আর ভেবেছি কেউ আমাকে চায় না।
অবন্তীর ঠাই বাস্তবতায় না হলেও
ও থাকবে আমার কল্পনায়, চিন্তায় আর চেতনায়,
অবিরাম ভাবনায় । ওকে কতটা পছন্দ করি কখনো বুঝতে দেই নি , বলি নি,
কীংবা বলতে গেলেও শব্দ খুজে পাই নি, শব্দ দিয়ে আর বাক্য গঠন হয় নি।
ভালোই হয়েছে, সব কিছু বলা হয়ে গেলে হয়তো আর টান থাকতো না,
এই শূন্য তা,এই হাহাকার টা কাজ করতো না....
আজ থেকে আরো কয়েক বছর পর কোনো এক বর্ষার রাতে
আমার ঘুম আসবে না, আমি বিছানায় এপাশ ওপাশ করা বাদ দিয়ে জানালার পর্দা সরিয়ে গিয়ে দাড়াবো ।
বাইরে ঝুম বৃষ্টি দেখে আমার তখন অবন্তীর কথা মনে পড়বে,
খুউব বেশি মনে পড়বে ।
ও বলেছিলো, কোনো এক বর্ষার রাতে তুমি আমি ঝুম বৃষ্টি তে ভিজবো সারা রাত,
যে পর্যন্ত না গা গরম হয়ে জ্বর আসবে ততক্ষণ ভিজতেই থাকবো..
তখন আমার বয়স হয়েছে অনেক, ডাক্তার বলেছে ঠান্ডা লাগাতে বারণ।
তারপরেও আমি একাই দরজা খুলে বের হবো..
বৃষ্টিতে গিয়ে দাড়াবো, কারণ বৃষ্টিতে কাদলে কেউ বুঝবে না..
পুরুষ দের তো আবার কাদতে নেই..!
-কবি #অবন্তী
০৯-০১-২০২১