Skip to main content

খন্ড গল্প - ০১

বিকেল থেকেই গুড়িগুড়ি বৃষ্টি, আকাশ ভাড় হয়ে আছে কালো মেঘে।
যেকোনো সময়ে বড় ধরনের ঝড় শুরু হতে পারে। আমি বসে আছি রতনের চা এর দোকানে। সাথে ছাতা নেই। কাজেই বের হওয়ার সাহস পাচ্ছি না। ঢাকা-ময়মনসিংহ হাই ওয়ে এর পাশে ছোট্ট টং দোকান। মুখোমুখি দুটা বেঞ্চ।
সাই সাই করে বাস যাচ্ছে, মাল বোঝাই ট্রাক যাচ্ছে।এগুলো বসে বসে দেখা ছাড়া আর কোনো কাজ আপাতত নেই।
দোকানদার একটু পরপর বিরষ মুখে আমার দিকে তাকাচ্ছে। খুব সম্ভবতঃ আমার অস্তিত্ব ই তার বিরক্তির কারণ। প্রায় এক ঘন্টা হলো বসে আছি কিন্তু একটা চা ও খেলাম না । শুধুই তার কাস্টমার বসার জায়গা দখল করে আছি।
টাকা থাকলে অবশ্য এই বিরক্তি থেকে তাকে মুক্তি দিতাম। প্রতিদিন এর মতোই বিকেলে হাটতে বের হয়েছি হঠাৎই আবহাওয়া ১৮০ ডিগ্রী এংগেল এ ঘুরে গেলো! কে জানতো এমন হবে! নইলে টাকা নিয়েই বের হতাম। জীবনে আসলে কখন কি হয় বলা যায় না কিছুই।
রতন চা এর কাপ ধুয়ে আমার পায়ের সামনে পানি ফেললো । সে তার বিরক্তির শেষ সীমানায়...
আচ্ছা,এর পর ও আমায় কি করবে..?
ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিবে..?
মনে হয় না । ঘাড় ধাক্কা দিতে হলে স্ট্যাটাস এর প্রয়োজন আছে । ঘাড় ধাক্কা দেয়া শ্রেণী রা সাধারণত বড়লোক হয় ।
অফিস থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয় ,ফ্ল্যাট থেকে বের করে দেয় ...সাহেব রা । সে তুলনায় রতন নিতান্ত ই গো বেচারা মানুষ । ছোট্ট একটা টং এর দোকান তার । তার দোকানের নিয়ম অমান্য কারী কে ঘাড় ধাক্কা দেয়ার সাহস হয়ে উঠবে না । এসব মানুষ রা মনের মাঝে যন্ত্রণা নিয়েই জীবন পার করে দেয় । অধিকার খাটাতে পারে না । অধিকার খাটাতে বিত্তের প্রয়োজন ।

এখান থেকেও জীবনের অনেক বড় একটা শিক্ষা পেলাম ।
পৃথিবীতে কোনো কিছুই আসলে বিনামূল্যে অন্ততঃ মানুষ এর কাছে থেকে আশা করা যায় না । মুল্য তোমাকে দিতে ই হবে । বৃষ্টি তে আটকে দিয়ে তার কাছে একটু আশ্রয় চাইছি তাতেও সেখানে চা খাওয়ার ব্যাপার চলে আসছে । মূল্য দিতে দিতেই জীবন চলে যায় ।
ভেবে দেখলাম, আমার চারপাশের প্রতিটা মানুষ ই এমন । সবাই ই কিছু না কিছু আমার কাছে চায় কিন্তু শুধু একজন পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে কেউ আমাকে চায় না ।

এসব সাতপাচ যখন চিন্তা ভাবনা করছি তখন ই হুস করে একটা পাজেরো থামলো দোকানের সামনে ।
প্রায় সাথে সাথেই কেউ আমাকে ডাকলো ,
আরে কবি না ? শুনে বুঝলাম , অবন্তীর গলা !
তাকিয়ে দেখি জানালায় অবন্তির হাসি হাসি মুখ !
এখানে কি করো ?
আমি বললাম , কিছু না , বৃষ্টি থামার অপেক্ষা করি ।
তুমি হঠাত কোথা থেকে আসলে ?
আসি নি , যাচ্ছি ।
বাসায় ভালো লাগছিলো না , তাই ভাবলাম একটু বের হই ।
কোথায় যাবো ঠিক করি নি । এখানে থামলাম চা খাবো বলে ।
আমি বললাম , নিচে নেমে আসো ।
ও চলে আসলো । অবন্তি রতন কে কড়া করে চা এর অর্ডার দিলো ।
দেখলাম রতনের বিরক্তি ভাব টা নিমিষেই উবে গেলো । কেমন একটা সমীহ সমীহ ভাব চলে এসেছে । আমাকে তুলে দিয়ে নতুন করে আমার আর অবন্তীর জন্য গামছা দিয়ে বেঞ্চ মুছে দিলো । যদিও মুছার প্রয়োজন ছিলো না । আমি মনে মনে হাসলাম । টাকা মুহূর্তের মাঝে পরিস্থিতি বদলে দেয় !

কি ব্যাপার ? চুপ কেন ?
অবন্তীর কথায় আবার হুস ফিরে আসলো । বললাম ,না তেমন কিছু না ।
একটা ব্যাপার খেয়াল করেছো ?
কি ?
এই যে বেশির ভাগ সময় যখন ই বৃষ্টি হয় আর আমি বাইরে থাকি ,তখন ই তোমার সাথে কীভাবে যেনো দেখা হয়ে যায় ।
হ্যা , আসলেই !
আরো মজার ব্যাপার হলো তোমার সাথে আমার প্রথম দেখাও কিন্তু বৃষ্টি তেই হয়েছিলো ।
মনে আছে ?
হ্যা , খুব মনে আছে । আমি রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম কাকভেজা হয়ে , হঠাত তুমি এসে বললে তোমার কাছে এক্সট্রা ছাতা আছে চাইলে আমি নিতে পারি ! ব্যাপার টা আমার কাছে এতটাই অদ্ভুত লাগছিলো ,আমি নির্বাক হয়ে গেলাম । অপরিচিত একটা মেয়ে এসে তার ছাতা আমাকে দিবে নিজেকে কখনো এমন শ্রেণীর পুরুষ ভাবি নি । আমার ধারণা ছিলো পৃথিবীর সবাই ই কোনো না কোনো কারণে আমার উপর বিরক্ত । শুধু বিরক্ত বললে ভুল হবে , মহা বিরক্ত । তার মাঝে এমন আচমকা তোমার মতো সুন্দরী এসে আমার মাথায় ছাতা মেলে ধরবে , ব্যাপার টা হজম করতে আমার বেশ সময় লেগেছিলো ।
আমার কথা শুনে অবন্তি ফিক করে হেসে দিলো ।
আমি বললাম , একটা কথা বলবো?
হ্যা বলো । তোমার কথা শুনে জীবন পার করে দিতে পারি । এতো পারমিশন নেয়ার কি আছে । বলে ফেলো ।
আমি বললাম , আচ্ছা আমার জায়গায় যদি সেদিন অন্য কেউ হতো তাহলেও কি তুমি ছাতা মেলে ধরতে গিয়ে ?
কি জানি ! হয়তো ধরতাম , হয়তো ধরতাম না ।
প্রকৃতি খুব ই অনিশ্চিত বুঝলে !
কিন্তু আমার মনে হয় , তোমার জায়গায় অন্য কেউ হলে ধরতাম না ।
তোমার চেহারায় মায়া মায়া ভাব টা প্রবল যেটা অন্য কারোর মাঝে পাবো বলে মনে হয় না ।
তোমার চারপাশের সব কিছুকে তুমি মায়া দিয়ে নিজের সীমানায় আবদ্ধ করে ফেলো । আমিও তোমার মায়ার প্রাচীর টপকাতে পারি নি ।
কেনো ? টপকে যেতে চাও ? যাও মুক্ত করে দিলাম ।
আমি কাউকে ধরে রাখি না , মানুষ ই আমাকে ধরে রাখে মানুষ ই আমাকে ছেড়ে দেয় । আমি মানুষের প্রয়োজনে ব্যবহৃত হওয়া টিস্যু ছাড়া আর কিছু না ।

অবন্তি এবার রেগে গেলো আমার কথায় । তুমি রাখবে তোমার এইসব দার্শনিক কথা ? চা তো শেষ । চলো উঠি ।
আমি বললাম , আমার কাছে ছাতা নেই । আমি আরো কিছুক্ষণ থাকবো । তাছাড়া , এখন চা খাওয়া হয়ে গেছে । রতন আমার উপর আর বিরক্ত হয়ে থাকবে না । আরো কিছুক্ষণ বসা যাবে ।
কি বলছো এসব রতন বিরক্ত হবে মানে ?
তুমি বুঝবে না । যাও তুমি ।
নাহ , তোমাকে না নিয়ে কোথাও যাচ্ছি না । আজকে তুমিও যাচ্ছো আমার সাথে ।
কই যাবো ?
এইতো আমি যেখানে যাই । এখনও ঠিক করি নি । দেখি কোথায় যাওয়া যায় ।
আমি বুঝলাম, অবন্তি আমাকে না নিয়ে যাবে না । একটু আগে ও ভুল বলেছে । মায়া মায়া ভাব আমার না , ওর মাঝেই বেশি । এই মায়াবতীর মায়া কে অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা প্রকৃতি আমাকে দেয় নি ।
মায়া খুব ই খারাপ জিনিশ , শুধু হাহাকার সৃষ্টি করে ।
আমি গাড়িতে উঠলাম , অনিশ্চিত গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ।

বাইরে ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে , অবন্তি গাড়ি চালাচ্ছে ... আমি প্রবল ঘোরের মাঝে চলে যাচ্ছি । ঘুম ঘুম ভাব আছে , কোথা থেকে টুংটাং শব্দ আসছে ।
আচ্ছা , অবন্তি কি চুড়ি পড়েছে ? কাচের চুড়ি ?
একবার মনে হলো চোখ মেলে দেখি , পরে মনে হলো থাক ।
দেখতে গিয়ে হয়তো দেখবো চুড়ি পড়ে নি । সবই আমার উর্বর মস্তিষ্কের কল্পনা ! তখন মন খারাপ হবে । তারচেয়ে কল্পনা করে নেয়া যাক , কাচের চুড়ি ই পড়েছে । কল্পনা করতে পারাটা অনেক বড় একটা ক্ষমতা ।
একজন ফকির ও কল্পনায় রাজা হতে পারে । কেউ তাকে আটকাবে না ।
আমি কল্পনার জগতে হারিয়ে গেলাম । চারপাশে অবন্তীর চুড়ির শব্দ হতেই থাকলো ... টুং টাং ...টুং টাং ...
(চলবে ...)

Popular posts from this blog

আমার খুব ক্লান্ত লাগে

হঠাৎ করেই আমার এমন পরিবর্তন হল নাকি আস্তে আস্তে বুঝি নি । তবে সত্যি বলতে আমার এখন খুব ক্লান্ত লাগে ! নিজের কন্টেক্সট এর বাইরে তো দূরের কথা নিজের কন্টেক্সট এর ভেতরে কিছু থাকলেও তা নিয়ে ভাবতে খুব ক্লান্ত লাগে যদি না সেইটা খুব ই বেশি প্যারা দিয়ে থকে । আমি মাথা ঘামাই না , এক্সট্রা effort দেই না । আমার চারিপাশে এতো ক্রাউড ! এতো নয়েস ! এতো ডেস্ট্রাকশন !! এতো এতো মন খারাপ করার মতো ঘটনা প্রতিদিন ঘটে , কয়টার দিকে তাকাবো আমি ... ফেইসবুকে ঢুকলেই দেখি দেশের নানারকম ইস্যু , রাজনৈতিক সমস্যা । নানান অনিয়ম , কেউ না কেউ খুব করুণ ভাবে মরে গেছে ... কোথাও না কোথাও বিশাল কিছু দুর্নীতি হয়ে গেছে ... এইসব । আগে আমার ভালো থাকতে , একটা ভালো দিন কাটাতে অনেক কিছুর প্রয়োজন পড়তো । এখন আর সেটা পড়ে নাহ , আমি চাহিদা কমিয়ে এনেছি । একটা সময় আমি ভাবতাম , দেশের সব কিছু ঠিক ভাবে চললে ... আমার আসে পাশের প্রতি টা মানুষ আমার এক্সপেকটেশন অনুযায়ী বিহেভ করলে আমার দিন টা ভালো যাবে , আমি সুখী হবো ! অথচ তা আজ অব্দি ঘটে নি । কোন দিন ঘটবেও নাহ । এখন অব্দি পৃথিবীর কোন ম...

অতীত ভ্রমণ

সময় গুলো কেমন যেন শীতের ভোরের কুয়াশা যেন কখনো কখনো মিলিয়ে যায় খুব দ্রুত আবার কখনো বা হিম শীতলতায় কাপন ধরায়..! অতীত নিয়ে ভাবনা গুলো ফের অতীতেও তোমায় ঘোরায় তোমায় পোড়ায় তোমায় বাচায়..! এই যে তুমি হাত বাড়িয়ে ধরছো আমায় ধরছো সময় ধরছো কি তা পাচ্ছো যা তা..? যেই অতীতে শালিক ঘুমায় চড়ুই ঘুমায় কোকিল ডাকে খুব আবেগে বাধতে মায়ায়.. শব্দের পর শব্দ দিয়ে বাক্য গুলো কেমন যেন হঠাৎ করেই যায় মিলিয়ে যায় হারিয়ে । অতীত যেন জন্ম নিলো শব্দ নিয়ে যেতে পালিয়ে । -কবি -অতঃপর অতীত ভ্রমণ ০৪-০১-২০২৩ 🌿

বিকেল বেলার কৃষ্ণচূড়া

আকাশ জুড়ে মেঘ জমেছে আঁধার আঁধার লাগছে কেমন হুহু করে শূন্যতারা আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়ায় যেমন.. ঝুম ঝুম ঝুম বৃষ্টি হবে এপাশ ওপাশ ভিজিয়ে যাবে ভুল হয়েছে, ভুল করেছি হঠাৎ আবার মনে হবে..! তোমার জন্য কাঠফাটা রোদ বিকেল বেলার কৃষ্ণচূড়া আমার জন্য মেঘলা আকাশ ঘাসফুল আর কল্পনারা..! -কবি ২৯-০৯-২০২২