কেটে গেছে বহু যুগ কিংবা শতাব্দী ,
মনে হয়েছে কিছু লিখি না আমি , লিখা আর হয়ে উঠে না ।
লিখি লিখি করেও আর লিখতে বসা হয় না । খাতা কলমের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছে বহু আগেই ।
এই ইলেক্ট্রনিক ডিভাইসের ভিড়ে কেনো যেন ঠিক ভাবে আবেগ গুলো প্রকাশ করা হয়ে উঠে না
যদিও এখন কিছু লিখা টা হয়ে গেছে সহজ থেকে সহজতর । এখন খাতা কলম নিয়ে বসা লাগে না ।
হুটহাট ফেইসবুকে পোস্ট দিয়ে দেয়া যায় ,
আদুরে টাচ স্ক্রিনের কল্যাণে আঙ্গুলের কষ্ট কমেছে বহুগুনে ।
এতো কিছুর পরেও তবুও কীসের যেন একটা অভাব আমাকে তাড়া করে ফিরে । আমাকে স্থির হতে দেয় না । কিছু একটা লিখার জন্য যতটা স্থিরতার প্রয়োজন ততটা স্থিরতা এই সত্ত্বা প্রায় ই হাতরে ফিরে । পায় না । ।
তবে, স্থিরতা ছিল একসময় ।
অনেক স্থির ছিলাম আমি । এই আমি । যা এখন বিশ্বাস করতেও কষ্ট হয় !
রাতের পর রাত কাটিয়েছি কবিতার পরের লাইনের ছন্দ মেলানোর জন্য শব্দ খুঁজে !
আজ (২০-০৩-২০২০) যখন পুরো পৃথিবী স্তব্ধ করোনা ভাইরাস এর জন্য তখন এই অবসরে হঠাত ই মনে পড়লো আমার সেই বেলাকার কথা ! ভাবলাম কিছু লিখি । মাঝে মাঝে প্রায় ই এমন হয় , দেখা যায় আয়োজন করে লিখতে বসি কিন্তু ভেতর থেকে লেখা আসছে না । আবার রাস্তায় বাসে যেতে যেতে মাথায় কতো লেখা ঘুরপাক খায় ! লিখতে পারি না । আমার মাঝে এলোমেলো ভাব টা প্রবল । সাজিয়ে গুছিয়ে কোন কিছু করা,খুব কষ্ট সাধ্য আমার জন্য । হুটহাট এখন লিখতে বসে গেলাম , পরিবেশ টাও অবশ্য অনুকুলেই আছে ।
যাই হোক , যা বলছিলাম । আমি অবসরে কেনো আছি ,একটু পরিষ্কার করা প্রয়োজন ব্যাপার টা , নইলে অদূর ভবিষ্যতে কেউ এটা পড়লে কনফিউসড হয়ে যেতে পারে । এখন যদিও বিষয় টা সবাই জানে কিন্তু সামনে জানবে না , ভুলে যাবে । ভুলে যাওয়াই মানুষ এর স্বভাব । মানুষ তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ জিনিশ গুলো ভুলে গিয়ে অপ্রয়োজনীয় জিনিশ গুলো সারা জীবন মনের মাঝে আগলে ধরে রাখে । সেগুলো আবার দুধ কলা দিয়ে পুষে , যেনো গায়ে গতরে আরো বাড়ে, বড় হয় । মানব সন্তান অপ্রয়োজনীয় জিনিশ কে বড় করে দেখতে বড়ই ভালোবাসে ।
পৃথিবীর জন্য সময় টা এখন খুব খারাপ । ভুল বললাম , সময় খারাপ পৃথিবীর জন্য না , পৃথিবীর মানুষের জন্য । ছড়িয়ে গেছে এক ভাইরাস , নাম করোনা । গণহারে মানুষ মরছে । আক্রান্ত মানুষের সংস্পর্শে আসলেই আরেকজন ও আক্রান্ত হচ্ছে । ভয়ানক ব্যাপার । জীবনের প্রতি অসম্ভব মায়া আর পৃথিবীর উপর ভালোবাসা থেকেই বেচে থাকার জন্য তীব্র আকাংখা জন্ম নিয়েছে মনে । নিজেকে তাই আটকে ফেলছি চার দেয়ালের ভেতর । ২৪ ঘন্টার মাঝে বেশির ভাগ সময় কাটছে কম্পিউটার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে । বাকি সময় ব্যয় হয় ঘুম আর খাওয়াতে । নাহ আরেকটা আছে , টয়লেটেও তো যাই !!!
ভাবতে আসলেই খুব অবাক লাগে ! একটা মানুষের বেচে থাকার কি এক প্রবল ইচ্ছা !! আগ্রহ ! একজন মৃত্যু পথযাত্রী মানুষ কে যদি জিজ্ঞেস করা হয় কি চাও তুমি ? টাকা ? বাড়ি ? গাড়ি ? তার উত্তর কি হবে ? বাড়ি চাই কিংবা টাকা চাই , গাড়ি চাই টাইপ কিছু ? আমার মনে হয় না ! আমার বিশ্বাস ও বলবে , কিছুই চাই না , শুধু বাঁচতে চাই । বাচার জন্য ই বাঁচতে চাই !!! কী অপরিসীম ভালোবাসা পৃথিবীর জন্য ! আমরা পৃথিবীকে ভালোবাসি কিন্তু এর ভেতরের মানুষকে ভালোবাসতে পারি না যার জন্যই আমাদের এতো অভিমান অভিযোগ থাকে পুরো জীবন জুরে । যুদ্ধ ,কলোহ ...আছেই আছেই ।। এই অভিমান নিয়েই আমরা বাচি , বেচে থাকতে চাই হাজার বছর । শত সহস্র শতাব্দী ।
লিখতে বসেছি আমার সেই অবসর বেলাকার কথা আর চলে গেলাম যুদ্ধ কলহে !
ইলেক্ট্রনিক ডিভাইসে লিখে অবশ্য একদিক থেকে শান্তি ই আছে ।
লেখা আগে পিছে করা যায় ,কোনো ভুল হলে কেটে ফেলা যায় ।
পাঠক যখন পড়বে লেখা তখন এই কাটাকুটির খেলা তার চোখে আসবে না ।
সব রয়ে যাবে কীবোর্ড এর ব্যাকস্পেস বাটনে ।
ঝকঝকে ফটফটে লেখা পাবে পাঠক , কোনো বানান ভুলও থাকবে না ।
বুদ্ধিমান এই যন্ত্র মানুষ কে ভুল করার সুযোগ ই দিচ্ছে না !
কোনো ভুল বানান লিখলে মেশিন অটোম্যাটিক ভাবে শুদ্ধ করে দিচ্ছে !
মানুষ মাত্র ই তো ভুল , ভুল ছাড়া বাঁচা যায় ??? অসহ্য ব্যাপার ।
বলছিলাম সেই বেলাকার কথা , যখন আমি কবিতার ছন্দের এক মোহময় জগতে বাস করতাম । কত রাত পেরিয়েছে বই সামনে নিয়ে মনে মনে খুঁজে গেছি কবিতার পরের লাইনের মেলানো ছন্দের শব্দ ! বন্ধু মহলে নাম ছিলো কবি । কবিতার প্রতি অসীম ভালো লাগা কাজ করতো সেই বালক কাল থেকেই । বয়স টা ঠিক মনে নেই , ২য় কিংবা ৩য় শ্রেণি তে হয়তো পড়ি । তখন লিখা হয়েছিলো প্রথম কবিতা । সেই ডায়েরী টা কই যে হারালো ! স্কুলের ডায়েরী ছিলো । আমি যত্ন করে লিখতাম । তারিখ দিয়ে দিয়ে । তারপরে আস্তে আস্তে বড় হতে থাকি , আমার কবিতা চর্চা ও চলতে থাকে । তবে কবিতার ভুত ঘাড়ে চেপে বসে ভালো করে যখন নবম শ্রেণিতে উঠি । তার পেছনে যথেষ্ঠ কারণ ও ছিলো । আমি একজন কবি গুরু পেয়েছিলাম । নাম জিয়াউল স্যার । আহা !!! কি মায়াকাড়া ছিলো সেই চেহারা ! আমার স্মৃতির পাতায় উনি সব সময় ই থাকবেন উজ্জল এক নক্ষত্র হয়ে । আমার কবিতা চর্চার স্বর্ণ যুগ চলছিল তখন তার ছোঁয়ায় । তাঁর সাথে পরিচয় হয় এক কোচিং এ গিয়ে । স্কুলের শিক্ষক না । চোখের নিচে গাঢ় কালো দাগ রাত জাগার কারণে ,মায়া কাড়া চোখ আর শরীরে জড়ানো কালো একটা শাল । তাঁর সব কিছুতেই কবি ভাব প্রবলভাবে ফুটে উঠত ।
পড়াতেন বাংলা ব্যাকরণ । যার কিছুই আমার মাথায় ঢুকতো না । সমাস, কারক, বিভক্তি হাবিজাবি । তবে একটা সময় কবিতার জন্য তাঁর সাথে অনেক ভাব হয়ে যায় আমার । আমি কবিতা লিখতাম , সেটা তিনি ক্লাস শেষে সবাই কে আবৃতি করে শুনাতেন । তখন আমার মাঝে যে ভালো লাগা টুকু কাজ করতো পৃথিবীর কোনো কিছুর সাথে সেটা তুলনা করা যাবে না । আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতাম । স্যার বলতেন, কীরে কবি ,কেমন হলো ?? আমি চুপ থাকতাম , শুধু হাসতাম । বলার মতো কিছু খুঁজে পেতাম না । প্রায় ই এমন হয় আমার । যখন যাকে যেটা বলা উচিত তখন বলতে পারি না । বলার জন্য আমার মস্তিষ্ক শব্দ খুঁজে পায় না , সেই শব্দ দিয়ে বাক্য গঠন হয় না । আমার মুখেও বাক্য আসে না । সমাস,কারক, বিভক্তি বহু পরের বিষয় ।
মাঝে মাঝে এমন হতো যে ক্লাস শেষে অফিসে গিয়ে বসতাম স্যার এর সাথে । গল্প করতাম । অনেক অনেক গল্প । আমার লেখা কবিতায় শব্দ সিলেকশন এ ভুল থাকলে স্যার ধরিয়ে দিতেন । আমি ঠিক করে নিতাম । অদ্ভুত সুন্দর এক সময় ছিল । বন্ধুবান্ধব পরম মমতায় ডাকতো ,ওই কবি ...বলে । ভালো লাগতো আমার । অসম্ভব ভালো লাগতো ... স্বপ্ন দেখতাম একসময় আমার কবিতা পুরো বিশ্বের মানুষ পড়বে , জানবে আমাকে ! পেপারে লিখা লিখি হবে !! আহহহ !!! রাতে বিছানায় শুলে ঘুমের আগেই স্বপ্ন চলে আসতো , স্বপ্ন এনে দিতো কবিতার ছন্দের সেই গভীর ঘোর !!!!
এভাবেই দিন গিয়েছে , হয়েছে রাত পরে আবার সকাল ।। মেঘে মেঘে কেটে গেছে বহু বেলা । আমি ম্যাট্রিক দিলাম । যথা সময়ে রেজাল্ট বের হলো ... বাংলা ২য় পত্র তে ফেইল করার কথা ছিলো । পেয়ে গেলাম এ প্লাস !! দৌড়ে গেলাম স্যার এর কাছে । কোচিং অফিসে । গিয়ে সালাম দিলাম , কেনো যেন আমার চোখে পানি চলে আসলো । আমি পানি লুকানোর চেষ্টা করছি আর মাথা নিচু করে আছি । স্যার পরম মমতায় আমার মাথায় হাত দিলেন । খুব ইচ্ছা করছিলো স্যার কে জড়িয়ে ধরার । জড়িয়ে ধরে বলতাম স্যার এই পুরো কৃতিত্ব টাই আপনার । কিন্তু আমি কিছুই করতে পারলাম না । চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলাম ।
জীবনে প্রায় সময় ই আমি " কিং কর্তব্য বিমূঢ় " হয়ে থেকেছি যখন কিছু করার কথা ছিলো । আমি করতে পারি নি । হয়তো প্রকৃতি চায় নি । থেকে গেছে মনের মাঝে চির অতৃপ্ততা । ।
স্যার বসতে বললেন । আমি বসলাম । মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হচ্ছিল না আমার । স্যার বললেন , কবি তুই ই সবার আগে রেজাল্ট পাইয়া ছুটে আসলি , আর কেউ আসলো না । অথচ তর চাইতেও অনেকে অনেক ভালো রেজাল্ট করেছে । তাদের মনে তৃপ্তি নাই , তর মনে আছে । তুই অনেক বড় হবি । বল কি চাস ? তরে কিছু দেয়া উচিত গিফট ।
এই বলে স্যার অফিস থেকে একটা কলম দিতে চাইলেন , আমি বললাম, না স্যার ঠিক আছে । আমি কলম নিলাম না । যার জন্য এখনো আফসোস করি । কেন নিলাম না তখন ??? স্যার এর একটা কিছু আমার কাছে থাকতো ।
তখনো তো জানতাম না , অইটাই ছিলো শেষ দেখা । আর দেখা হবে না স্যার এর সাথে । তারপরে কত খুঁজলাম !!! নাই নাই নাইইইইইইইইইইই !! কোথাও নাই মানুষ টা । একদম শূন্যে মিলিয়ে গেলো !!!
যেখানেই থাকু্ন আপনি স্যার , পরম করুণাময় যেন আপনাকে ভালো রাখেন এটাই কামনা করি । আপনার সেই মায়াকাড়া চাহুনি এখনও চোখে ভাসে আমার । আর ভাসবেও অনন্ত কাল যতদিন বাঁচবো ।। আজ এই টুক ই থাকুক আর লিখতে ইচ্ছে করছে না ।
---------------------------------------------- ২০-০৩-২০২০
রাত ১১ টা ৩০ ।
মনে হয়েছে কিছু লিখি না আমি , লিখা আর হয়ে উঠে না ।
লিখি লিখি করেও আর লিখতে বসা হয় না । খাতা কলমের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছে বহু আগেই ।
এই ইলেক্ট্রনিক ডিভাইসের ভিড়ে কেনো যেন ঠিক ভাবে আবেগ গুলো প্রকাশ করা হয়ে উঠে না
যদিও এখন কিছু লিখা টা হয়ে গেছে সহজ থেকে সহজতর । এখন খাতা কলম নিয়ে বসা লাগে না ।
হুটহাট ফেইসবুকে পোস্ট দিয়ে দেয়া যায় ,
আদুরে টাচ স্ক্রিনের কল্যাণে আঙ্গুলের কষ্ট কমেছে বহুগুনে ।
এতো কিছুর পরেও তবুও কীসের যেন একটা অভাব আমাকে তাড়া করে ফিরে । আমাকে স্থির হতে দেয় না । কিছু একটা লিখার জন্য যতটা স্থিরতার প্রয়োজন ততটা স্থিরতা এই সত্ত্বা প্রায় ই হাতরে ফিরে । পায় না । ।
তবে, স্থিরতা ছিল একসময় ।
অনেক স্থির ছিলাম আমি । এই আমি । যা এখন বিশ্বাস করতেও কষ্ট হয় !
রাতের পর রাত কাটিয়েছি কবিতার পরের লাইনের ছন্দ মেলানোর জন্য শব্দ খুঁজে !
আজ (২০-০৩-২০২০) যখন পুরো পৃথিবী স্তব্ধ করোনা ভাইরাস এর জন্য তখন এই অবসরে হঠাত ই মনে পড়লো আমার সেই বেলাকার কথা ! ভাবলাম কিছু লিখি । মাঝে মাঝে প্রায় ই এমন হয় , দেখা যায় আয়োজন করে লিখতে বসি কিন্তু ভেতর থেকে লেখা আসছে না । আবার রাস্তায় বাসে যেতে যেতে মাথায় কতো লেখা ঘুরপাক খায় ! লিখতে পারি না । আমার মাঝে এলোমেলো ভাব টা প্রবল । সাজিয়ে গুছিয়ে কোন কিছু করা,খুব কষ্ট সাধ্য আমার জন্য । হুটহাট এখন লিখতে বসে গেলাম , পরিবেশ টাও অবশ্য অনুকুলেই আছে ।
যাই হোক , যা বলছিলাম । আমি অবসরে কেনো আছি ,একটু পরিষ্কার করা প্রয়োজন ব্যাপার টা , নইলে অদূর ভবিষ্যতে কেউ এটা পড়লে কনফিউসড হয়ে যেতে পারে । এখন যদিও বিষয় টা সবাই জানে কিন্তু সামনে জানবে না , ভুলে যাবে । ভুলে যাওয়াই মানুষ এর স্বভাব । মানুষ তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ জিনিশ গুলো ভুলে গিয়ে অপ্রয়োজনীয় জিনিশ গুলো সারা জীবন মনের মাঝে আগলে ধরে রাখে । সেগুলো আবার দুধ কলা দিয়ে পুষে , যেনো গায়ে গতরে আরো বাড়ে, বড় হয় । মানব সন্তান অপ্রয়োজনীয় জিনিশ কে বড় করে দেখতে বড়ই ভালোবাসে ।
পৃথিবীর জন্য সময় টা এখন খুব খারাপ । ভুল বললাম , সময় খারাপ পৃথিবীর জন্য না , পৃথিবীর মানুষের জন্য । ছড়িয়ে গেছে এক ভাইরাস , নাম করোনা । গণহারে মানুষ মরছে । আক্রান্ত মানুষের সংস্পর্শে আসলেই আরেকজন ও আক্রান্ত হচ্ছে । ভয়ানক ব্যাপার । জীবনের প্রতি অসম্ভব মায়া আর পৃথিবীর উপর ভালোবাসা থেকেই বেচে থাকার জন্য তীব্র আকাংখা জন্ম নিয়েছে মনে । নিজেকে তাই আটকে ফেলছি চার দেয়ালের ভেতর । ২৪ ঘন্টার মাঝে বেশির ভাগ সময় কাটছে কম্পিউটার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে । বাকি সময় ব্যয় হয় ঘুম আর খাওয়াতে । নাহ আরেকটা আছে , টয়লেটেও তো যাই !!!
ভাবতে আসলেই খুব অবাক লাগে ! একটা মানুষের বেচে থাকার কি এক প্রবল ইচ্ছা !! আগ্রহ ! একজন মৃত্যু পথযাত্রী মানুষ কে যদি জিজ্ঞেস করা হয় কি চাও তুমি ? টাকা ? বাড়ি ? গাড়ি ? তার উত্তর কি হবে ? বাড়ি চাই কিংবা টাকা চাই , গাড়ি চাই টাইপ কিছু ? আমার মনে হয় না ! আমার বিশ্বাস ও বলবে , কিছুই চাই না , শুধু বাঁচতে চাই । বাচার জন্য ই বাঁচতে চাই !!! কী অপরিসীম ভালোবাসা পৃথিবীর জন্য ! আমরা পৃথিবীকে ভালোবাসি কিন্তু এর ভেতরের মানুষকে ভালোবাসতে পারি না যার জন্যই আমাদের এতো অভিমান অভিযোগ থাকে পুরো জীবন জুরে । যুদ্ধ ,কলোহ ...আছেই আছেই ।। এই অভিমান নিয়েই আমরা বাচি , বেচে থাকতে চাই হাজার বছর । শত সহস্র শতাব্দী ।
লিখতে বসেছি আমার সেই অবসর বেলাকার কথা আর চলে গেলাম যুদ্ধ কলহে !
ইলেক্ট্রনিক ডিভাইসে লিখে অবশ্য একদিক থেকে শান্তি ই আছে ।
লেখা আগে পিছে করা যায় ,কোনো ভুল হলে কেটে ফেলা যায় ।
পাঠক যখন পড়বে লেখা তখন এই কাটাকুটির খেলা তার চোখে আসবে না ।
সব রয়ে যাবে কীবোর্ড এর ব্যাকস্পেস বাটনে ।
ঝকঝকে ফটফটে লেখা পাবে পাঠক , কোনো বানান ভুলও থাকবে না ।
বুদ্ধিমান এই যন্ত্র মানুষ কে ভুল করার সুযোগ ই দিচ্ছে না !
কোনো ভুল বানান লিখলে মেশিন অটোম্যাটিক ভাবে শুদ্ধ করে দিচ্ছে !
মানুষ মাত্র ই তো ভুল , ভুল ছাড়া বাঁচা যায় ??? অসহ্য ব্যাপার ।
বলছিলাম সেই বেলাকার কথা , যখন আমি কবিতার ছন্দের এক মোহময় জগতে বাস করতাম । কত রাত পেরিয়েছে বই সামনে নিয়ে মনে মনে খুঁজে গেছি কবিতার পরের লাইনের মেলানো ছন্দের শব্দ ! বন্ধু মহলে নাম ছিলো কবি । কবিতার প্রতি অসীম ভালো লাগা কাজ করতো সেই বালক কাল থেকেই । বয়স টা ঠিক মনে নেই , ২য় কিংবা ৩য় শ্রেণি তে হয়তো পড়ি । তখন লিখা হয়েছিলো প্রথম কবিতা । সেই ডায়েরী টা কই যে হারালো ! স্কুলের ডায়েরী ছিলো । আমি যত্ন করে লিখতাম । তারিখ দিয়ে দিয়ে । তারপরে আস্তে আস্তে বড় হতে থাকি , আমার কবিতা চর্চা ও চলতে থাকে । তবে কবিতার ভুত ঘাড়ে চেপে বসে ভালো করে যখন নবম শ্রেণিতে উঠি । তার পেছনে যথেষ্ঠ কারণ ও ছিলো । আমি একজন কবি গুরু পেয়েছিলাম । নাম জিয়াউল স্যার । আহা !!! কি মায়াকাড়া ছিলো সেই চেহারা ! আমার স্মৃতির পাতায় উনি সব সময় ই থাকবেন উজ্জল এক নক্ষত্র হয়ে । আমার কবিতা চর্চার স্বর্ণ যুগ চলছিল তখন তার ছোঁয়ায় । তাঁর সাথে পরিচয় হয় এক কোচিং এ গিয়ে । স্কুলের শিক্ষক না । চোখের নিচে গাঢ় কালো দাগ রাত জাগার কারণে ,মায়া কাড়া চোখ আর শরীরে জড়ানো কালো একটা শাল । তাঁর সব কিছুতেই কবি ভাব প্রবলভাবে ফুটে উঠত ।
পড়াতেন বাংলা ব্যাকরণ । যার কিছুই আমার মাথায় ঢুকতো না । সমাস, কারক, বিভক্তি হাবিজাবি । তবে একটা সময় কবিতার জন্য তাঁর সাথে অনেক ভাব হয়ে যায় আমার । আমি কবিতা লিখতাম , সেটা তিনি ক্লাস শেষে সবাই কে আবৃতি করে শুনাতেন । তখন আমার মাঝে যে ভালো লাগা টুকু কাজ করতো পৃথিবীর কোনো কিছুর সাথে সেটা তুলনা করা যাবে না । আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতাম । স্যার বলতেন, কীরে কবি ,কেমন হলো ?? আমি চুপ থাকতাম , শুধু হাসতাম । বলার মতো কিছু খুঁজে পেতাম না । প্রায় ই এমন হয় আমার । যখন যাকে যেটা বলা উচিত তখন বলতে পারি না । বলার জন্য আমার মস্তিষ্ক শব্দ খুঁজে পায় না , সেই শব্দ দিয়ে বাক্য গঠন হয় না । আমার মুখেও বাক্য আসে না । সমাস,কারক, বিভক্তি বহু পরের বিষয় ।
মাঝে মাঝে এমন হতো যে ক্লাস শেষে অফিসে গিয়ে বসতাম স্যার এর সাথে । গল্প করতাম । অনেক অনেক গল্প । আমার লেখা কবিতায় শব্দ সিলেকশন এ ভুল থাকলে স্যার ধরিয়ে দিতেন । আমি ঠিক করে নিতাম । অদ্ভুত সুন্দর এক সময় ছিল । বন্ধুবান্ধব পরম মমতায় ডাকতো ,ওই কবি ...বলে । ভালো লাগতো আমার । অসম্ভব ভালো লাগতো ... স্বপ্ন দেখতাম একসময় আমার কবিতা পুরো বিশ্বের মানুষ পড়বে , জানবে আমাকে ! পেপারে লিখা লিখি হবে !! আহহহ !!! রাতে বিছানায় শুলে ঘুমের আগেই স্বপ্ন চলে আসতো , স্বপ্ন এনে দিতো কবিতার ছন্দের সেই গভীর ঘোর !!!!
এভাবেই দিন গিয়েছে , হয়েছে রাত পরে আবার সকাল ।। মেঘে মেঘে কেটে গেছে বহু বেলা । আমি ম্যাট্রিক দিলাম । যথা সময়ে রেজাল্ট বের হলো ... বাংলা ২য় পত্র তে ফেইল করার কথা ছিলো । পেয়ে গেলাম এ প্লাস !! দৌড়ে গেলাম স্যার এর কাছে । কোচিং অফিসে । গিয়ে সালাম দিলাম , কেনো যেন আমার চোখে পানি চলে আসলো । আমি পানি লুকানোর চেষ্টা করছি আর মাথা নিচু করে আছি । স্যার পরম মমতায় আমার মাথায় হাত দিলেন । খুব ইচ্ছা করছিলো স্যার কে জড়িয়ে ধরার । জড়িয়ে ধরে বলতাম স্যার এই পুরো কৃতিত্ব টাই আপনার । কিন্তু আমি কিছুই করতে পারলাম না । চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলাম ।
জীবনে প্রায় সময় ই আমি " কিং কর্তব্য বিমূঢ় " হয়ে থেকেছি যখন কিছু করার কথা ছিলো । আমি করতে পারি নি । হয়তো প্রকৃতি চায় নি । থেকে গেছে মনের মাঝে চির অতৃপ্ততা । ।
স্যার বসতে বললেন । আমি বসলাম । মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হচ্ছিল না আমার । স্যার বললেন , কবি তুই ই সবার আগে রেজাল্ট পাইয়া ছুটে আসলি , আর কেউ আসলো না । অথচ তর চাইতেও অনেকে অনেক ভালো রেজাল্ট করেছে । তাদের মনে তৃপ্তি নাই , তর মনে আছে । তুই অনেক বড় হবি । বল কি চাস ? তরে কিছু দেয়া উচিত গিফট ।
এই বলে স্যার অফিস থেকে একটা কলম দিতে চাইলেন , আমি বললাম, না স্যার ঠিক আছে । আমি কলম নিলাম না । যার জন্য এখনো আফসোস করি । কেন নিলাম না তখন ??? স্যার এর একটা কিছু আমার কাছে থাকতো ।
তখনো তো জানতাম না , অইটাই ছিলো শেষ দেখা । আর দেখা হবে না স্যার এর সাথে । তারপরে কত খুঁজলাম !!! নাই নাই নাইইইইইইইইইইই !! কোথাও নাই মানুষ টা । একদম শূন্যে মিলিয়ে গেলো !!!
যেখানেই থাকু্ন আপনি স্যার , পরম করুণাময় যেন আপনাকে ভালো রাখেন এটাই কামনা করি । আপনার সেই মায়াকাড়া চাহুনি এখনও চোখে ভাসে আমার । আর ভাসবেও অনন্ত কাল যতদিন বাঁচবো ।। আজ এই টুক ই থাকুক আর লিখতে ইচ্ছে করছে না ।
---------------------------------------------- ২০-০৩-২০২০
রাত ১১ টা ৩০ ।